
Amirul Sizan
Editor-in-Chief, Bongo Wiki
ভাঙচুরের রাজনীতি ও হাদির অসমাপ্ত ইনকিলাব
ওসমান হাদির মৃত্যুর পর যে সহিংসতা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তার অন্যতম ভয়াবহ দৃশ্য ছিল গণমাধ্যমের ওপর বর্বর হামলা; প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, জীবনভয়ে পালাতে থাকা মানুষ। এটি শুধু দুইটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আক্রোশ নয়; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জনআলোচনার জায়গা, আর সমাজের চিন্তা করার ক্ষমতার ওপর সরাসরি আঘাত।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে “আরেকটা প্রথম আলো” বা “আরেকটা ডেইলি স্টার” কেউ দাঁড় করাতে পারেননি, এটি শুধু বাজারের শক্তি না, সংগঠন গড়া, সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ, বিশ্বাসযোগ্যতা আর ধারাবাহিকতার ক্ষেত্রে সামগ্রিক দুর্বলতার চিত্র। যখন কেউ নিজের বিকল্প তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তখন পুরোনো জায়গা ভেঙে ফেলার লোভ সহজ হয়ে যায়। ভাঙচুরের রাজনীতি আসলে এই ব্যর্থতাকেই আড়াল করার এক কৌশল।
প্রথম আলো বা ডেইলি স্টারের অবস্থান নিয়ে অস্বস্তি, অভিযোগ, বিরোধিতা এসব থাকতেই পারে; বরং থাকা উচিত। গণমাধ্যম সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু সমালোচনার সৎ পথ তো তিনটিই:
নতুন পত্রিকা বা প্ল্যাটফর্ম দাঁড় করানো
বিকল্প পাঠক–সমাজ গড়ে তোলা
তথ্য, বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন করা
এই পথ কঠিন। এখানে সময়, দক্ষতা, সংগঠন আর ধৈর্য লাগে। এর বদলে যখন মব জড়ো করে অগ্নিসংযোগ করা হয়, তখন আসলে বোঝা যায় তর্কে ও বৌদ্ধিক প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার ভয় থেকেই সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। “আরেকটা প্রথম আলো” বানানোর সাহস না থাকলে, “প্রথম আলো পোড়ানো” এক ধরনের কম খরচের রাজনৈতিক নাটক হয়ে ওঠে।
হাদির আদর্শ: ইনকিলাব মঞ্চের সাংস্কৃতিক কল্পনা
শরিফ ওসমান হাদি (প্রচলিতভাবে ওসমান হাদি নামে পরিচিত) ছিলেন জুলাই বিদ্রোহের অন্যতম মুখ, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক, এবং আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী—অর্থাৎ ছাত্র–আন্দোলন, সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম আর প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নতুন ধরনের চরিত্র। ঢাকার বিজয়নগরে নির্বাচনী প্রচার শুরুর সময় মুখোশধারী হামলাকারীদের গুলিতে তাঁর মাথায় গুলি লাগে; পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ইনকিলাব মঞ্চের ভাষায় হাদি শুধু ‘এন্টি-ইন্ডিয়া’ স্লোগানের নেতা ছিলেন না; তিনি সাম্রাজ্যবাদ, আঞ্চলিক আধিপত্য, রাষ্ট্রীয় দমন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাবনা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন। গান, কবিতা, পোস্টার, মিছিল, রাস্তার ভাষণ—এই সবকিছুর মাধ্যমে তিনি তরুণদের সামনে দেখিয়েছেন: রাজনীতি শুধু নির্বাচনী অঙ্ক না, এটি এক সাংস্কৃতিক কল্পনা, যেখানে ন্যায়বিচার, স্বনির্ভরতা আর মর্যাদার প্রশ্ন একসাথে ওঠে।
এই কল্পনার সঙ্গে প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার–সমালোচনা থাকতে পারে, কিন্তু হাদির পথ ভাঙচুরকে কেন্দ্র করে ছিল না; বরং ছিল নতুন মঞ্চ বানানোর দিকে।
শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল, তার প্রতি তখন অনেকেরই আশা ছিল—গণতান্ত্রিক সংস্কার, মানবাধিকার রক্ষা, আইনের শাসন, এবং মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য নতুন পরিবেশ তৈরি হবে। এক বছরের কম সময়ে সেই আশার সঙ্গে যে বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে:
নির্বাচনের তারিখ নিয়ে দীর্ঘ টালবাহানা ও অনিশ্চয়তা, আইন–শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থতা, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করা, মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য প্রকৃত নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে অক্ষমতা;
হাদির ওপর হামলার পরও একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের নিশ্চয়তা দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিধা ও দুর্বলতা বিশেষভাবে সামনে এসেছে। একদিকে শোকদিবস ঘোষণার মতো প্রতীকী পদক্ষেপ, অন্যদিকে সহিংসতা দমন ও গণমাধ্যম সুরক্ষায় ব্যর্থতা এই দ্বৈততা সরকারকে নৈতিক সংকটে দাঁড় করিয়েছে।
একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকারের গ্যারান্টি দেওয়া, যাতে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের দিকে সমাজ এগোতে পারে। সে জায়গায় হাদির হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী মিডিয়া–নির্যাতন দেখিয়েছে রাষ্ট্র আর নাগরিকের মধ্যকার আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে।
ভারত–বাংলাদেশ রাজনীতি: সন্দেহ ও অসম ক্ষমতার ছায়া
হাদির ওপর হামলার পরই গুঞ্জন ওঠে, হামলাকারীরা নাকি ভারত সীমান্তে পালিয়ে গেছে — এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে তদন্ত ও সহযোগিতা চেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্যদিকে ভারত এই ঘটনার সঙ্গে যেকোনো যোগাযোগের অভিযোগ ‘চরমভাবে অস্বীকার’ করেছে এবং ঘটনাটিকে “চরমপন্থী গোষ্ঠীর প্রচার” বলে উল্লেখ করেছে।
এদিকে দিল্লিতে আশ্রিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্রমাগত রাজনৈতিক মন্তব্য, তাকে ফেরত পাঠানোর দাবিতে ঢাকা–দিল্লির টানাপোড়েন, এবং সীমান্ত–রাজনীতির নানা অমীমাংসিত ইস্যু, সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাসের মেঘ আরও ঘন করেছে। ভারতের টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিকে নিয়ে উসকানিমূলক, অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
হাদি নিজে যে ভারত–বিরোধী স্লোগানের মাধ্যমে এক ধরনের জাতীয় মর্যাদার রাজনীতি দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন, সেই রাজনীতির ভেতরেও প্রশ্ন ছিল — কীভাবে প্রতিবেশী সম্পর্কের সমালোচনা করা যায়, কিন্তু ঘৃণা নয়; স্বাধীন কূটনীতির দাবি তোলা যায়, কিন্তু ঘৃণার রাজনীতিকে উসকে না দিয়ে। আজ যখন হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুদ্ধ ক্ষোভের পাশাপাশি কাঁচা জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা জেগে উঠছে, তখন তার মূল রাজনৈতিক কল্পনাকে হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি আরও বেশি।
ক্রোধকে কোথায় নিয়ে যাবে সমাজ?
একজন তরুণ নেতা, যিনি জুলাই বিদ্রোহের মুখ হয়ে উঠেছিলেন, নির্বাচনের ময়দানে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন, তিনিই যখন প্রকাশ্য সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তখন সমাজে ক্রোধ তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্রোধ যখন গণমাধ্যম পোড়ানো, সাংবাদিকদের শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলার হুমকি, এবং শহরজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টির দিকে মোড় নেয়, তখন এটি হাদির রাজনীতির ধারাবাহিকতা না থেকে উল্টো তার বিকৃত রূপে পরিণত হয়।
হাদির ইনকিলাব মঞ্চ রাষ্ট্র, বহুজাতিক কর্পোরেট, আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদ—সবকিছুর বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা হওয়ার কথা ছিল। সেই প্ল্যাটফর্মের নাম ধরে সংবাদপত্রে আগুন লাগানো, সাংবাদিককে বন্দি করে রাখা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা করা—এগুলো হাদির নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা এক ধরনের অনৈতিক ভাঙচুরের রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়।
ভাঙচুর নয়, ইনকিলাব মঞ্চের বিকাশ
ওসমান হাদির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা দেখাতে গেলে কয়েকটি জায়গায় আমাদের সৎ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নতুন সাংস্কৃতিক মঞ্চ ও পাঠশালা গড়া, শহর ও মফস্বলে নাট্যদল, পাঠচক্র, রাজনৈতিক শিক্ষা–আসর, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী — এসবের মাধ্যমে তরুণদের জন্য ধারাবাহিক চিন্তার জায়গা তৈরি করা। গণমাধ্যমের সঙ্গে তর্কের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
প্রথম আলো–ডেইলি স্টার–সহ যে কোনো পত্রিকার ভাষা, ফ্রেম, তথ্যকে তথ্য দিয়েই চ্যালেঞ্জ করা; পাল্টা লেখা, গবেষণাধর্মী প্রতিবেদন, ফ্যাক্টচেক, পাঠকের আস্থা অর্জন—এগুলোই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কাজ।
হাদির হত্যার ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত, বিচার নিশ্চিত করা, মানবাধিকার ও গণমাধ্যম–নিরাপত্তা বিষয়ে বাস্তব সংস্কার দাবি করা, এসবের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক বৈধতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো।
ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে যুক্তিগ্রাহ্য আলোচনা;
সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, রাজনৈতিক আশ্রয় এসব বিষয়ে কঠিন প্রশ্ন তুলতে হবে, কিন্তু ঘৃণা ও সহিংসতার দিকে না গিয়ে যুক্তি ও তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে।
আমরা যদি সত্যিই ‘হাদি’ হতাম
“আমরা সবাই হাদি হলে কি প্রথম আলো–ডেইলি স্টার ভাঙতাম?” — এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বারবার মনে হয়, হয়তো না। হয়তো আমরা প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে পত্রিকার সম্পাদককে প্রশ্ন করতাম, টকশোতে অংশ নিয়ে যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতাম, আরও কঠিন, আরও অস্বস্তিকর লেখা লিখতাম। কিন্তু পোড়া কাগজ আর ভাঙা কাচের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের সভ্যতা প্রমাণ করতাম না।
হাদির উত্তরাধিকার ভাঙা ভবনে নয়, নতুন মঞ্চে; পোড়া নিউজরুমে নয়, নতুন পাঠাগারে; আতঙ্ক সৃষ্টিতে নয়, যুক্তির রাজনীতিতে। যদি সত্যি “ইনকিলাব মঞ্চ”কে বাঁচাতে হয়, তবে সেটিকে ভাঙচুরের স্লোগান থেকে উদ্ধার করে আবার সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
এই দেশে যদি ইনকিলাব মঞ্চের মতো সাংস্কৃতিক শক্তি গড়ে ওঠে — বহুমাত্রিক, আত্মসমালোচনাশীল, সাহসী — তাহলে প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার ভাঙার প্রয়োজন পড়বে না; বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রশ্ন করতে বাধ্য হবে। হাদির প্রতি সবচেয়ে সৎ শ্রদ্ধা হয়তো সেখানেই, ভাঙচুরের রাজনীতি থেকে সরে এসে, বৌদ্ধিক লড়াইয়ের রাজনীতিতে ফেরার সিদ্ধান্তে।